মহান ভাষা আন্দোলন ও অমর একুশের প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে এবারও বাংলা একাডেমি সোহরাওয়ার্দী উদ্যান ও একাডেমি প্রাঙ্গণে আয়োজন করতে যাচ্ছে অমর একুশে বইমেলা-২০২৫। আগামী ১ ফেব্রুয়ারি এ মেলার উদ্বোধন করবেন অন্তর্বর্তী সরকারপ্রধান। জ্ঞান ও বুদ্ধিবৃত্তিক জাতি গঠনের লক্ষ্যে আয়োজিতব্য এ মেলার এবারের প্রতিপাদ্য নির্ধারণ করা হয়েছে ‘জুলাই গণঅভ্যুত্থান: নতুন বাংলাদেশ বিনির্মাণ’। এ পরিপ্রেক্ষিতে শুরু হয়েছে স্টল ও প্যাভিলিয়ন তৈরির প্রাথমিক কাজ। তবে এর মধ্যে সৃজনশীল প্রকাশকদের তিন সংগঠনের প্রতীকী অনশন, প্যাভিলিয়নের ধরনে পরিবর্তন এবং ১৮টি প্রকাশনা সংস্থাকে কালো তালিকাভুক্ত করার মতো দাবি নিয়ে নতুন বছরের আগে থেকেই শুরু হয় আলোচনা ও সমালোচনা, যে কারণে প্রকাশক, প্রকাশনা ও সংশ্লিষ্টদের মাঝে সৃষ্টি হয় বিভক্তির। যদিও মেলা পরিচালনা কমিটি জানিয়েছে, পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে সৃষ্ট সব সমস্যা সমাধান করে এবং প্রতিকূলতা পেরিয়ে মেলার প্রস্তুতি চলমান রয়েছে। অতি শিগগির লটারির মাধ্যমে স্টল-প্যাভিলিয়ন বরাদ্দ দেওয়া হবে এবং এবারের মেলা অন্যান্য বারের তুলনায় নতুনত্ব নিয়ে অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে বলেও জানানো হয়েছে।
মেলার প্রস্তুতি শুরুর আগেই সবচেয়ে বেশি আলোচনা-সমালোচনার বিষয় হয়ে ওঠে ১৮টি প্রকাশনা সংস্থার একটি তালিকা। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সে তালিকা প্রকাশ করে একদল প্রকাশক দাবি করেন, ওই প্রকাশনা সংস্থাগুলো গত সরকারের সুবিধাভোগী। সেগুলোকে কালো তালিকাভুক্ত করতে হবে এবং প্যাভিলিয়নের বদলে সাধারণ স্টল বরাদ্দ দিতে হবে। যদিও সে তালিকায় থাকা প্রকাশনা সংস্থাগুলোর পক্ষ থেকে এসব অভিযোগকে উদ্দেশ্যপ্রণোদিত হিসেবে দাবি করা হয়। কালো তালিকাভুক্ত করার দাবি ওঠা ১৮ প্রকাশনী হলো—জিনিয়াস পাবলিকেশনস, নালন্দা, পার্ল পাবলিকেশনস, অন্যপ্রকাশ, আগামী প্রকাশনী, বিশ্বসাহিত্য ভবন, অনিন্দ্য প্রকাশ, অনুপম প্রকাশনী, অন্বেষা প্রকাশন, কাকলী প্রকাশনী, জার্নিম্যান বুকস, তাম্রলিপি, পাঠক সমাবেশ, পুঁথি নিলয়, মিজান পাবলিশার্স, সময় প্রকাশন, চারুলিপি প্রকাশন এবং শব্দশৈলী।
এদিকে, গত ১৫ জানুয়ারি বাংলা একাডেমির শহীদ মুনীর চৌধুরী সভাকক্ষে বইমেলা পরিচালনা কমিটির চতুর্থ সভা অনুষ্ঠিত হয়। সভায় সভাপতিত্ব করেন বইমেলা পরিচালনা কমিটির সভাপতি ও বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক অধ্যাপক মোহাম্মদ আজম। সভায় বইমেলার সার্বিক অবস্থা ও বইমেলায় প্রকাশকদের অধিকতর অন্তর্ভুক্তি নিশ্চিত করতে স্টল বরাদ্দ বিষয়ে বিস্তৃত আলোচনা করা হয় এবং অন্য প্রকাশ, আগামী প্রকাশনী, কাকলী প্রকাশনী, পাঠক সমাবেশ, পুঁথিনিলয়, সময় প্রকাশন, জিনিয়াস পাবলিকেশনস, নালন্দা, শব্দশৈলী, জনতা প্রকাশ (শিশু), ময়ূরপঙ্খী (শিশু), বাবুই (শিশু) এই ১২টি প্রতিষ্ঠানের স্টল বা প্যাভিলিয়ন বরাদ্দে পরিবর্তন আনার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
এর আগে, গত ৩ নভেম্বর এবারের বইমেলা উপলক্ষে স্টল ভাড়া ৫০ শতাংশ কমানো, প্যাভিলিয়ন পদ্ধতি বাতিল, আমলাতান্ত্রিক জটিলতা নিরসন, বই বাছাই প্রতিনিধি মনোনয়ন, আন্তর্জাতিক বইমেলায় বৈষম্যের শিকার প্রকাশকদের অগ্রাধিকার দেওয়া, স্বৈরাচারের দোসর প্রকাশকদের বিষয়ে তদন্ত ও আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ এবং অধিকসংখ্যক প্রকাশক প্রতিনিধি মনোনয়নসহ ১৬ দফা দাবি জানিয়ে বৈষম্যবিরোধী সৃজনশীল প্রকাশকরা বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক ও সভাপতিকে একটি স্মারকলিপি দেন। বৈষম্যবিরোধী সৃজনশীল প্রকাশক সমিতির পক্ষে সিনিয়র সহসভাপতি রাজিয়া রহমান (জাগৃতি প্রকাশনী)-বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক অধ্যাপক মোহাম্মদ আজমের কাছে প্রস্তাবনাপত্র, স্বৈরাচারের দোসর লুটপাটকারী প্রকাশকদের তালিকা, বইমেলায় প্রকাশক প্রতিনিধি মনোনয়ন তালিকা প্রদান করেন। পরে বাংলা একাডেমির সভাপতি অধ্যাপক আবুল কাসেম ফজলুল হকের হাতে অনুরূপ স্মারকলিপি দেন প্ল্যাটফর্মটির সভাপতি সাঈদ বারী।
স্টল বরাদ্দ নিয়ে কিছুটা ঝামেলা পরিলক্ষিত হলেও প্রাণের এই মেলা আয়োজনে ধাপে ধাপে এগিয়ে চলছে সার্বিক প্রস্তুতি। বিগত এক দশকের মতো এবারও মেলার আয়োজন বাংলা একাডেমি প্রাঙ্গণে আর সোহরাওয়ার্দী উদ্যান হলেও পরিবর্তন এসেছে সার্বিক বিন্যাসে। এরই মধ্যে শুরু হয়েছে স্টল তৈরির প্রাথমিক কাজ। সংশ্লিষ্টরা আশা পোষণ করছেন, গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী নতুন বাংলাদেশের চেতনা প্রতিফলিত হবে এবারের বইমেলায়। মেলা ভেন্যুতে গিয়ে দেখা গেছে, মাপামাপি, মাটি খোঁড়াখুঁড়ি, বাঁশ-কাঠের অবকাঠামো নির্মাণের কাজ করছেন নির্মাণ শ্রমিকরা। পাশাপাশি বিদ্যুৎ সংযোগ, বাতি লাগানো, নিরাপত্তার স্বার্থে সিসিটিভি ক্যামেরার স্থাপনসহ নানা আনুষঙ্গিক কাজও এগিয়ে চলছে।
সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে কর্মরত আফজাল নামে এক নির্মাণশ্রমিক বলেন, ১০-১২ দিন ধরে কাজ করছি। ফেব্রুয়ারির আগেই আমাদের কাজ শেষ হওয়ার কথা রয়েছে। এক কাঠমিস্ত্রি বলেন, আমরা আলমারি, টেবিলসহ কাঠের তৈরি বিভিন্ন জিনিসপত্র তৈরির কাজ করছি।
জানা গেছে, অমর একুশে বইমেলা ২০২৫-এ অংশগ্রহণ করতে আগ্রহী প্রকৃত প্রকাশনা প্রতিষ্ঠানগুলোর স্টলের জন্য আবেদনপত্র জমা দেওয়ার শেষ দিন ছিল গত ১৬ জানুয়ারি, যা শুরু হয় গত ২৬ ডিসেম্বর থেকে। এবার মেলায় অংশ নিচ্ছে মোট প্রায় ৬০০টি প্রতিষ্ঠান। প্যাভিলিয়ন বরাদ্দ পাচ্ছে ২ ডজনের বেশি প্রকাশনা সংস্থা। তবে বাংলা একাডেমির পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে তালিকা প্রকাশের আগ পর্যন্ত এ বিষয়ে পুরোপুরি নিশ্চিত হওয়া যাচ্ছে না। মেলার স্টল ভাড়া এক ইউনিট ১৫ হাজার ১৮০ টাকা, দুই ইউনিট ৩১ হাজার ৬২৫, তিন ইউনিট ৫৯ হাজার ৮০০, চার ইউনিট ৮৩ হাজার ৪৯০ ও প্যাভিলিয়ন ভাড়া (২০ x ২০) ১ লাখ ৫১ হাজার ৮০০, (২৪ x ২৪) ১ লাখ ৮৬ হাজার ৩০০ টাকা এবং মিডিয়া ও স্বাস্থ্য সেল ৩ হাজার ৪৫০ টাকা।
বাংলা একাডেমি কর্তৃপক্ষ জানায়, বইমেলা সাপ্তাহিক ছুটির দিন ও একুশে ফেব্রুয়ারি ছাড়া প্রতিদিন বিকেল ৩টা থেকে রাত ৯টা; ছুটির দিন বেলা ১১টা থেকে রাত ৯টা পর্যন্ত সর্বসাধারণের জন্য উন্মুক্ত থাকবে। শুক্রবার দুপুর ১টা থেকে বিকেল ৩টা ও শনিবার দুপুর ১টা থেকে বেলা ২টা পর্যন্ত বিরতি থাকবে। শুক্র ও শনিবার বেলা ১১টা থেকে দুপুর ১টা পর্যন্ত শিশুপ্রহর থাকবে। একুশে ফেব্রুয়ারি প্রথম প্রহর অর্থাৎ সকাল ৭টা থেকে রাত ৯টা পর্যন্ত বইমেলা সর্বসাধারণের জন্য উন্মুক্ত থাকবে। দুপুর ১টা থেকে বিকেল ৩টা পর্যন্ত বিরতি থাকবে।
এবারের মেলার নীতিমালায় বলা হয়, বাংলা একাডেমি প্রচলিত কমিশনে একাডেমির বই বিক্রয় করবে। বইমেলায় অংশগ্রহণকারী অন্যান্য প্রতিষ্ঠান ২৫ শতাংশ কমিশনে বই বিক্রয় করবে। রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনবিরোধী, মুক্তিযুদ্ধবিরোধী, ২০২৪-এর গণঅভ্যুত্থানবিরোধী, ‘যে কোনো জাতিসত্তাবিরোধী, অশ্লীল, রুচিগর্হিত, শিষ্টাচারবিরোধী, সাম্প্রদায়িক, ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত করে এমন বা জননিরাপত্তার জন্য বা অন্য কোনো কারণে বইমেলার পক্ষে ক্ষতিকর কোনো বই বা পত্রিকা বা দ্রব্য অমর একুশে বইমেলায় বিক্রয়, প্রচার ও প্রদর্শনকারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
এতে আরও বলা হয়, বইমেলার প্রতিটি প্রবেশদ্বারে নিরাপত্তার স্বার্থে আর্চওয়ের ব্যবস্থা থাকবে। মেলা প্রাঙ্গণে একাডেমির নিজস্ব ক্যান্টিন ও একাডেমি কর্তৃক বরাদ্দকৃত খাবারের স্টল থাকবে। কর্তৃপক্ষের অনুমোদিত নীতিমালা অনুযায়ী মানসম্মত খাবারের স্টল বরাদ্দ দেওয়া হবে। বইমেলার প্রাথমিক চিকিৎসাকেন্দ্রে ডাক্তার ও অ্যাম্বুলেন্সের ব্যবস্থা থাকবে। সার্বিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী যে কোনো সময় কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলোচনাসাপেক্ষে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করবে। বইমেলা চলাকালীন শৃঙ্খলা ও নিরাপত্তা পর্যবেক্ষণের জন্য একাডেমি ও প্রকাশক প্রতিনিধিদের সমন্বয়ে একটি ‘শৃঙ্খলা কমিটি’ গঠিত হবে। কমিটি পর্যায়ক্রমে সব বিষয় তদারকি করবে। মেলা প্রাঙ্গণে সার্বক্ষণিক দমকল বাহিনী প্রস্তুত থাকবে। মেলা সিসি ক্যামেরার আওতাভুক্ত থাকবে। নারী ও পুরুষের নামাজের জন্য পৃথক ব্যবস্থা থাকবে। তথ্যকেন্দ্র সংলগ্ন স্থানে মা ও শিশু কর্নার থাকবে। বইমেলা প্রাঙ্গণে বিশুদ্ধ খাবার পানির ব্যবস্থা থাকবে। নতুন বইয়ের মোড়ক উন্মোচনের জন্য ‘নতুন বই উন্মোচন মঞ্চ’ এই নামে একটি নির্দিষ্ট স্থানের ব্যবস্থা থাকবে।
এ ছাড়া, বইমেলায় একটি ‘লেখক বলছি মঞ্চ’ থাকবে। এতে প্রতিদিন নতুন বই সম্পর্কে লেখক-পাঠক-দর্শকের মধ্যে আলোচনা, মতবিনিময়, প্রশ্নোত্তর পর্ব চলবে। আগের বছরে প্রকাশিত ‘বিষয় ও গুণগত মানসম্মত’ সর্বাধিক সংখ্যক বই প্রকাশের জন্য সংশ্লিষ্ট প্রকাশনা প্রতিষ্ঠানকে ‘চিত্তরঞ্জন সাহা স্মৃতি পুরস্কার’ প্রদান; ‘শৈল্পিক বিচার’-এ সেরা গ্রন্থের জন্য প্রকাশনা প্রতিষ্ঠানকে ‘মুনীর চৌধুরী স্মৃতি পুরস্কার’; শিশুতোষ গ্রন্থের মধ্য থেকে ‘গুণগতমান বিচার’-এ সর্বাধিক সংখ্যক বইয়ের জন্য সংশ্লিষ্ট প্রকাশনা প্রতিষ্ঠানকে ‘রোকনুজ্জামান খান দাদাভাই স্মৃতি পুরস্কার’ এবং বইমেলায় অংশগ্রহণকারী প্রকাশনা প্রতিষ্ঠানের মধ্য থেকে স্টলের ‘নান্দনিক অঙ্গসজ্জা’য় সর্বশ্রেষ্ঠ হিসেবে বিবেচিত প্রতিষ্ঠানকে তিন ক্যাটাগরিতে ‘শিল্পী কাইয়ুম চৌধুরী স্মৃতি পুরস্কার’ প্রদান করা হবে।
অমর একুশে বইমেলা-২০২৫ পরিচালনা কমিটির অন্যতম সদস্য ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর সহযোগী অধ্যাপক সাইফুদ্দীন আহমদ বলেন, এবারের মেলার প্রস্তুতি যেভাবে নেওয়া প্রয়োজন সেভাবেই নেওয়া হচ্ছে। এর আগের মেলায় অনেক স্টল রাজনৈতিক বিবেচনায় বরাদ্দ দেওয়ার ঘটনা ঘটেছে। এমনও ঘটনা ঘটেছে যে, কেউ কেউ কোনো বই ছাড়াই স্টল নিয়ে দলীয় পার্টি অফিসের মতো ব্যবহার করেছে। তবে এ বিষয়সহ বেশকিছু কারণে পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে শুরুর দিকে কিছুটা সমস্যা হয়েছিল। এ ব্যাপারে এবার আমরা কঠোর হয়েছি। প্যাভিলিয়নের ধরন কেমন হবে, সে ব্যাপারেও আমাদের সিদ্ধান্ত এসেছে। এবারের বইমেলায় নতুনত্ব বিরাজ করবে বলে আশা করি। তাছাড়া, আমাদের সিদ্ধান্ত হয়েছে, এর পরের মেলার অন্তত ছয় মাস আগে থেকেই প্রস্তুতি নেওয়া শুরু হবে।
পরিচালনা কমিটির সদস্য সচিব ড. সরকার আমিন বলেন, বইমেলার কাজ চমৎকারভাবে এগিয়ে চলছে। শুরু থেকে কিছু বিতর্ক ও অভিযোগ ছিল, যেগুলো চমৎকারভাবে নিষ্পত্তি করা হয়েছে। এবার দারুণ একটা বইমেলা উপহার দেওয়ার কাজ আমরা করে যাচ্ছি। আমাদের কর্মীরা রাতদিন কাজ করছেন। স্টল বরাদ্দের বিষয়টি প্রায় ফাইনাল। খুব শিগগির লটারি করে আমরা স্টল বরাদ্দের বিষয়টি নিশ্চিত করতে পারব। লটারিতে যারা যে স্টল পাবেন, সে স্টল তারা নিজেদের মতো করে সাজানো শুরু করবেন। এবারের বইমেলা সুন্দর ও দর্শনীয় একটি মেলায় পরিণত হতে যাচ্ছে।


