গা পোড়ানো রোদ, অনেক রোদের মচ্ছব, রোদে রোদে যেন ঘুড়ির মতো কাটাকুটি খেলা চলে সেখানে—অনবরত। দিগন্তবিস্তৃত বালুর ওপর প্রতিফলিত হয়ে সূর্য হয়তো চিকচিক করে ওঠে। বালু আর সূর্য মিলে প্রকৃতিতে মুহূর্তেই যে চকমক করা সোনার গয়না তৈরি হয়, তা–ই কি চিলমারী—চিলমারীর বন্দর?
বন্দর মানে তো সেখানে জলের গল্পও থাকে, আসে সার সার নৌকা এবং নাওভরা মানুষজনের সুখ–দুঃখের ইতিবৃত্ত। চিলমারী বন্দরে ব্রহ্মপুত্র নদের ঢেউয়ে ঢেউয়ে কতশত গল্প ভেসে বেড়ায় রোদের মতো, সেসব গল্পেও চলে মারদাঙ্গা কাটাকুটি খেলা! কোনো একসময়, কালে কালে গল্পগুলো ইতিহাস হয়ে নেমে পড়ে স্থলে—বালুতে।
১৯৪৬ সাল। চিলমারী বাজারের তৎকালীন রেজিস্ট্রি অফিসের সামনে সবে গানের আসরের ইতি টেনেছেন কিংবদন্তি সংগীতশিল্পী আব্বাস উদ্দীন আহমদ। বাদ্যযন্ত্র বাঁধাছাদা হচ্ছে। এ সময় তাঁর কাছে আবারও গান গাওয়ার জন্য মিনতি করলেন দুজন। বললেন, পায়ে হেঁটে অনেক দূর থেকে এসেছেন তাঁরা। আব্বাস উদ্দীন তাঁদের বললেন, ‘এবার তো সব গোছানো হয়ে গেছে। পরেরবার এলে আপনাদের গান শোনাব।’
তখন ওই দুই ব্যক্তির একজন বললেন, ‘স্যার, তত দিন যদি আমরা না বাঁচি।’
শেষমেশ মানুষ দুটোর আবেগের কাছে পরাস্ত হয়ে তাঁদের গান শুনিয়েছিলেন আব্বাস উদ্দীন। এই গল্প ইতিহাসের সত্য। ‘ওকি গাড়িয়াল ভাই… আর কি কব দুষ্কের জ্বালা গাড়িয়াল ভাই’—এমন ভাওয়াইয়া গীতসুধার রসে যাঁরা আকুল হন, তাঁরাই তো চিলমারীর মানুষ।
বাংলাদেশের দরিদ্রতম জেলা কুড়িগ্রামের লোকেদের বস্তুগত চাহিদা এখনো অতটা তীব্র নয়, অল্প খেয়ে–পরেই এখানকার বেশির ভাগ পাবলিক খুশি।
পাটভর্তি গরু–মহিষের গাড়িগুলো দেবে যাচ্ছে বালু–কাদায়, ক্লান্ত–শ্রান্ত এক গাড়িয়াল—‘কত রব আমি পন্থের দিকে চায়া রে…’ বলে উদাস চোখে সেই গাড়িয়াল ভাই হয়তো উজানে যায়, পেছনে পড়ে থাকে তার বেড়ার ঘর, ঘরে হোগলা পাতার মতো তার একান্ত নারী; ওদিকে সবকিছু পেছন ফেলে গাড়িয়ালের সামনে তখন রাশি রাশি নৌকা–জাগা চিলমারীর বন্দর। বন্দরের উদ্দেশে বেরোনোর আগে ঘাড়ের গামছাটা কি বাড়িতে ফেলে এসেছে গাড়িয়াল? গাড়ি হাঁকিয়ে যে গাড়িয়াল চিলমারীর বন্দরে ছোটে, তার দিকে নির্নিমেষ তাকিয়ে দূর থেকে কেউ একজন হয়তো হাঁক দেয়, ‘কডই যান, বাহে?’
কল্পনায় চিলমারীর বন্দরের ছবিগুলো আমার কাছে ছিল এমনই। কারণ, বিভিন্ন বইপত্রে চিলমারী বন্দরের যে বিবরণ, তা এরূপ ছবি আঁকতেই প্ররোচিত করে। তা ছাড়া উত্তরবঙ্গের কুড়িগ্রাম জেলার একদম প্রান্তের এই বন্দর ঘিরে কাব্য–গান–গাথাও কম হয়নি। যুগে যুগে ব্রহ্মপুত্র নদের ঢেউয়ের সঙ্গে উত্তাল হয়েছে ‘বাহের দেশ’–এর মানুষের আবেগ। ‘ওকি গাড়িয়াল ভাই,/ হাঁকাও গাড়ি তুই চিলমারীর বন্দরে…’। আব্বাস উদ্দীনের এই গানের মধ্যে যেসব ছবি ঝকমক করে, মনশ্চক্ষে সেখানে দেখতে পাই, বালুময় প্রান্তরে চলছে একলা গাড়িয়াল। অদূরে ব্রহ্মপুত্রে নানা রঙের নৌকার পাল, ঢেউয়ের ছলাৎছল। তাই আমাদের সামষ্টিক মানসপটে চিলমারীর বন্দর মানে এক বিরহ–জাগানিয়া প্রান্তর। খানিকটা দারিদ্র্যপীড়িত, গরিবি রঙে আঁকাও কি নয়?
বলা ভালো, ব্রহ্মপুত্রের কারণেই মহিমান্বিত হয়ে উঠেছে চিলমারীর বন্দর। ইতিহাসও এই বন্দরের প্রাচীনত্ব স্বীকার করে। চীন থেকে ভারতের পূর্ব দিকে আসামে প্রবেশ করে এরপর কুড়িগ্রামে পৌঁছেছে ব্রহ্মপুত্র। দশম শতাব্দীর আগে ব্রহ্মপুত্র নদের পথ বেয়ে উত্তর–পূর্ব ভারত ও চীনের মধ্যে যে নৌপথ ও বাণিজ্যিক যোগাযোগ গড়ে উঠেছিল, আরব বণিকেরা সে সময় এই পথ দিয়ে তাঁদের পণ্য পরিবহন করতেন—এমন অনুমান ইতিহাসবিদদের। তবে এখন অব্দি চিলমারীসংক্রান্ত যেসব তথ্য পাওয়া যায়, তাতে দেখা যাচ্ছে, এই বন্দর প্রথমে মোগলদের একটি সীমান্তচৌকি এবং রণতরি নির্মাণের কেন্দ্র হিসেবে বিখ্যাত ছিল। আর সরকারিভাবে পয়লাবার চিলমারীর নাম পাওয়া যায় ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির শাসনামলে। ১৭৬৪ থেকে ১৭৭৭ সাল পর্যন্ত নৌ–অধ্যক্ষ ও ভূগোলবিদ মেজর জেমস রেনেল যখন বাংলার প্রধান নদ–নদীগুলো জরিপ করে মানচিত্র তৈরি করেন, তখন ১৭৬৫ সালে রেনেলের করা মানচিত্রে পাওয়া যায় চিলমারীর নাম। সে সময় অবশ্য এ এলাকার নাম ছিল মরুয়ারদহ।
নৌকায় বসে হালকা নীল রঙের পাঞ্জাবি পরা মানুষটি একসময় আকাশের দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘আল্লায় চালায়’
নৌকায় বসে হালকা নীল রঙের পাঞ্জাবি পরা মানুষটি একসময় আকাশের দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘আল্লায় চালায়’ছবি: প্রথম আলো
এই যে মরুয়ারদহ, দিনে দিনে সেটি চিলমারীর বন্দর হয়ে উঠল। ইতিহাস বলছে, গেল শতকের ত্রিশের দশকে জিতুর হাট বা পুরোনো চিলমারী ছিল বিকিকিনির মূল কেন্দ্র। বালু আর থিকথিকে কাদা ডিঙিয়ে গাইবান্ধা, রংপুর, কুড়িগ্রামের নানান এলাকা থেকে আসত পাটবোঝাই গরু-মহিষের গাড়ি। তারপর নৌকা বা জাহাজে চেপে সেই পাট পৌঁছে যেত কলকাতায়। ব্রিটিশ আমল থেকে বন্দর ঘিরে বাণিজ্যের প্রসার ঘটলেও এখানকার মানুষ ছিল প্রান্তিক ও নিরন্ন। তাদের অভাবঘেরা আকাশে রোদ উঠত বটে, তবে রোদটা বড়ই ক্ষণস্থায়ী, ভাঙনের মেঘ ওই রোদকে থিতু হতে দেয়নি কখনো। কেননা, ব্রহ্মপুত্রের একূল ভাঙা আর ওকূল গড়ার খেলায় বারবার নিঃস্ব হয়েছে চিলমারীর আমজনতা। গাড়িয়াল ভাইয়েরা তারপরও হাঁকিয়েছে গাড়ি। গানের ভাষায় বলে গেছে, ‘কত কাঁদিম্ মুই নিধুয়া–পাথারে!’
কখনো কখনো গাড়িয়ালদের ক্রন্দনের সেই সুর আমরাও কি শুনিনি? ‘মঙ্গা’ শব্দটি তো খুব বেশি দূরের ঘটনা নয় আমাদের জন্য। বৃহত্তর রংপুরে অভাবের অপর নামই ছিল মঙ্গা। যদিও মঙ্গাপীড়িত সেসব দিন এখন গত। কিন্তু এই নাগরিক জীবনে গাড়িয়াল ভাইদের দারিদ্র্যক্লিষ্ট অভাবের চেয়ে তাঁদের আবেগতাড়িত গানই বোধ করি আমাদের বেশি টেনেছে। কাব্য করে বলেছি, চিলমারীর বন্দর হলো ব্রহ্মপুত্র নদের পেটের পাশে বেড়ে ওঠা শিশু।
দিনকয়েক আগে মাঝহেমন্তের এক সকালে সেই বন্দরে যখন প্রথম পা দিলাম, কল্পনার আবেগ আর বাস্তবতার দ্বৈরথে চুরমার হয়ে গেল মনের অতলে থাকা ছবি। এখানে এখন মঙ্গা নেই। একই সঙ্গে পাটের কারবারসহ ‘নাই’ হয়ে গেছে অনেক কিছুই।
কোথায় সেই গরুর গাড়ি, গাড়িয়াল ভাই! গাড়িয়ালের প্রেয়সী কি আছে এখনো পন্থের দিকে চেয়ে?
ব্রহ্মপুত্রের ওপারে বান্ধালের চরে দেখা যায় এমন মনোরম দৃশ্য
ব্রহ্মপুত্রের ওপারে বান্ধালের চরে দেখা যায় এমন মনোরম দৃশ্যছবি: প্রথম আলো
২
চিলমারীর বন্দর দেখব বলে ঢাকা থেকে এক রাতে চেপে বসেছিলাম কুড়িগ্রামগামী বাসে। আমন্ত্রণটা এসেছিল কবি ও সংগঠক নাহিদ হাসানের তরফে। চিলমারীর সন্তান নাহিদ হাসানের ক্ষেত্রে ‘ঘরের খেয়ে বনের মোষ তাড়ানো’ কথাটি বড়ই লাগসই। হ্যাঁ, মোষ তিনি যথেষ্টই তাড়ান। চিলমারীতে নদীভাঙন প্রতিরোধের দাবিতে আন্দোলন করেছেন। এরপর কুড়িগ্রামে আন্তনগর ট্রেন চালুর দাবিতে আন্দোলন করলেন। ট্রেন চালু হলো। চালু হলো চিলমারী বন্দর এবং ফেরিও। এরপরও তাঁর কাজ থামেনি। এখন ‘রাষ্ট্রালাপ পাঠচক্র’ নামে একটি পাঠাগারের মাধ্যমে স্থানীয় ছেলেমেয়েদের বই পড়ানোর আন্দোলন করছেন। পেশাজীবনে স্কুলশিক্ষক এই মানুষ চিলমারীর ভেতরের এক চরে মাস্টারি করেন। তিনি যখন আমন্ত্রণ জানিয়ে বললেন, ‘ভাই, চলি আইসেন, সাহিত্য নিয়ে এখানকার তরুণ কবি–সাহিত্যিকদের কিছু কথা বইলবেন,’ তখন তো আর কথা থাকে না। তবে আমার দিক থেকে কথা বলাটা অসিলামাত্র, আসল বিষয় ছিল চিলমারী–দর্শন।
সেই চিলমারীর বন্দরে আমরা এলাম ইঞ্জিনচালিত অটোয় চেপে। কুড়িগ্রাম থেকে বন্দরটির দূরত্ব ১৮–১৯ মাইল। এই পুরো যাত্রাপথের দুপাশে চোখজুড়ানো ধানখেত, পাটখেত… একটু পরপর উঁকি দিচ্ছেন মান্যবর জলাশয় মহাশয়, কলাগাছগুলো মাথা তুলে দাঁড়িয়ে আছে বটে, কিন্তু সেই দাঁড়ানোর ভঙ্গিতেও কেমন যেন এখানকার মানুষের মতো ‘অল্পে তুষ্ট’ থাকার একটা ব্যাপার রয়েছে, নইলে পত্রকুলসমেত গাছগুলো খানিকটা নতমুখী কেন!
মুঠোফোনের ইউটিউবে কখনো কখনো আমাদের সঙ্গ দিচ্ছেন আব্বাস উদ্দীনের কন্যা ফেরদৌসী রহমান:
‘ওরে গাড়িয়াল বন্ধু রে
বন্ধু ছাড়িয়া রইতে পারি না রে
…
বন্ধুর গাড়ির চাকায় ভরেয়া গান
আদিয়া আদিয়া চলিয়া যান রে
ওকি গাড়িয়াল বন্ধু রে।’
ট্র্যাজেডি হলো, গাড়িয়াল বন্ধুর জন্য যতই আমাদের আবেগ উথলে উঠুক না কেন, এখন চিলমারীর বন্দরে যেতে হয় অটো কিংবা বাসে। বাহের দেশে গরু–মহিষের গাড়ি আর গাড়িয়ালের লেশ বর্তমানে খুঁজে পাওয়া দুষ্কর। সবার হাতে ফেসবুক। এদের মধ্যে কারও কারও দৃষ্টিতে ঔৎসুক্য, ‘ভিনদেশি’ আমাকে দেখে হয়তো স্থানিক উচ্চারণে বলতে চান, ‘কডই থাকি আইসছেন?’


